কালীকথাঃ শান্ত থেকে রুদ্র জানুন মায়ের বিভিন্ন রুপের মাহাত্ম্য
দ্য কোয়ারি ওয়েবডেস্কঃ কালী বা কালিকা হলেন একজন হিন্দু দেবী। তার অন্য নাম শ্যামা বা আদ্যাশক্তি। প্রধানত শাক্ত সম্প্রদায়ের মানুষ কালীপূজা করে থাকে।
তন্ত্র অনুসারে কালী দশমহাবিদ্যার প্রথম দেবী। শাক্তমতে কালী বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আদি কারণ। বাঙালি হিন্দু সমাজে কালীর মাতৃরূপের পূজা বিশেষ জনপ্রিয়।
পুরাণ ও তন্ত্র সাহিত্যে কালীর বিভিন্ন রূপের বর্ণনা পাওয়া যায়। এগুলি হল- দক্ষিণাকালী, মহাকালী , শ্মশানকালী, গুহ্যকালী, ভদ্রকালী, সিদ্ধকালী, আদ্যাকালী, চামুন্ডাকালী।
আবার বিভিন্ন মন্দিরে “ব্রহ্মময়ী”, “ভবতারিণী”, “আনন্দময়ী”, “করুণাময়ী” ইত্যাদি নামে কালী প্রতিমা পূজা করা হয়। এই সব রূপের মধ্যে দক্ষিণাকালীর বিগ্রহই সর্বাধিক পরিচিত ও পূজিত।
দক্ষিণাকালী
- দক্ষিণাকালী সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ মূর্তি। ইনি প্রচলিত ভাষায় শ্যামাকালী নামে পরিচিত।
- দক্ষিণাকালী মুক্তকেশী, চতুর্ভূজা এবং মুণ্ডমালাবিভূষিতা।
- তার বাম হাত দুটিতে নরমুণ্ড ও খড়্গ থাকে।
- ডান হাত দুটিতে বর ও অভয় মুদ্রা। তাঁর গায়ের রঙ মহামেঘের মত কালো।
- তিনি দিগম্বরী। তার গলায় মুণ্ডমালার হার।
- তিনি ত্রিনয়নী এবং মহাদেব শিবের বুকে দণ্ডায়মান। তাঁর ডান পা শিবের বক্ষে স্থাপিত।
তাত্ত্বিকের তার নামের যে ব্যাখ্যা দেন, দক্ষিণদিকের অধিপতি যম যে কালীর ভয়ে পলায়ন করেন, তার নাম দক্ষিণাকালী। তাঁর পূজা করলে সর্বোপরি সর্বশ্রেষ্ঠ ফলও দক্ষিণাস্বরূপ পাওয়া যায়।
হিন্দু বাঙালির গৃহে এই পূজার প্রচলনে নবদ্বীপের তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ দক্ষিণাকালীর শান্তি রূপকল্পনা করেন।
সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি নবদ্বীপে নিজের হাতে কালী প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে পূজা করেন। যা আগমেশ্বরী মাতা নামে খ্যাত।
সিদ্ধকালী মা
- সিদ্ধকালী কালীর একটি অখ্যাত রূপ।
- গৃহস্থের বাড়িতে সিদ্ধকালীর পূজা হয় না।
- তিনি মূলত সিদ্ধ সাধকদের ধ্যান আরাধ্যা।
- কালীতন্ত্রে তাকে দ্বিভূজা রূপে কল্পনা করা হয়েছে।
- অন্যত্র তিনি ব্রহ্মরূপা ভুবনেশ্বরী।
গুহ্যকালী
- গুহ্যকালী বা আকালীর রূপ গৃহস্থের নিকট অপ্রকাশ্য।
- তিনি সাধকদের আরাধ্য। তাঁর রূপকল্প ভয়ংকর।
- গুহ্যকালীর গায়ের গাঢ় মেঘের মত। তিনি দ্বিভূজা। গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা।
- পরনে ক্ষুদ্র কৃষ্ণবস্ত্র। মস্তকে জটা ও অর্ধচন্দ্র।
- চতুর্দিকে নাগফণা দ্বারা বেষ্ঠিত। নাগাসনে উপবিষ্টা।
- কথিত আছে গুহ্যকালী নিয়মিত শবমাংস ভক্ষণে অভ্যস্ত।
মহাকালী
- শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে তাকে আদ্যাশক্তি, দশবক্ত্রা, দশভূজা, দশপাদা ও ত্রিংশল্লোচনা রূপে কল্পনা করা হয়েছে।
- তাঁর দশ হাতে রয়েছে যথাক্রমে খড়্গ,চক্র,গদা,ধনুক,বাণ,পরিঘ,শূল,ভূসুণ্ডি,নরমুণ্ড ও
শঙ্খ। - ইনিও ভৈরবী; তবে গুহ্যকালীর সঙ্গে এঁর পার্থক্য
- রয়েছে।
- ইনি সাধনপর্বে ভক্তকে উৎকট ভীতি প্রদর্শন করলেও অন্তে তাকে রূপ, সৌভাগ্য, কান্তি ও শ্রী প্রদান করেন।
ভদ্রকালী
- ভদ্রকালী নামের ভদ্র শব্দের অর্থ কল্যাণ এবং কাল শব্দের অর্থ শেষ সময়।
- যিনি মরণকালে জীবের মঙ্গলবিধান করেন, তিনিই ভদ্রকালী।
- ভদ্রকালী নামটি অবশ্য শাস্ত্রে দুর্গা ও সরস্বতী দেবীর অপর নাম রূপেও ব্যবহৃত হয়েছে।
- কালিকাপুরাণ মতে, ভদ্রকালীর গায়ের রঙ অতসীপুষ্পের মত।
- মাথায় জটাজুট, কপালে অর্ধচন্দ্র ও গলদেশে কণ্ঠহার।
- তন্ত্রমতে অবশ্য তিনি কৃষ্ণবর্ণা, সর্বদা ক্ষুধিতা, মুক্তকেশী।
- তিনি জগৎকে গ্রাস করছেন।
- গ্রামবাংলায় অনেক জায়গায় ভদ্রকালীর বিগ্রহ নিষ্ঠাসহকারে পূজিত হয়।
চামুণ্ডাকালী
- চামুণ্ডাকালী বা চামুণ্ডা ভক্ত ও সাধকদের কাছে কালীর একটি প্রসিদ্ধ রূপ।
- দেবীভাগবত পুরাণ ও মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, চামুণ্ডা চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুর বধের নিমিত্ত দেবী দুর্গার ললাট থেকে উৎপন্ন হন।
- তাঁর গায়ের রঙ নীল পদ্মের মত।
- হস্তে অস্ত্র, দণ্ড ও চন্দ্রহাস। পরিধানে ব্যাঘ্রচর্ম।
- দুর্গাপূজায় মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধিক্ষণে আয়োজিত সন্ধিপূজার সময় দেবী চামুণ্ডার পূজা হয়।
- অশুভ শত্রুবিনাশের জন্য শক্তি প্রার্থনা করে তাঁর পূজা করা হয়।
- পুরানে আট প্রকার চামুণ্ডার কথা বলা হয়েছে।
শ্মশানকালী
- কালীর “শ্মশানকালী” রূপটির পূজা সাধারণত শ্মশানঘাটে হয়ে থাকে।
- এই দেবীকে শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনে করা হয়।
- শ্মশানকালী দেবীর গায়ের রং কাজলের মতো কালো। তিনি সর্বদা বাস করেন।
- তাঁর চোখদুটি রক্ত বর্ণের।
- বাঁ-হাতে মদ ও মাংসে ভরা পানপাত্র, ডান হাতে সদ্য কাটা মানুষের মাথা।
- তাঁর গায়ে নানারকম অলংকার থাকলেও, তিনি উলঙ্গ এবং মদ্যপান করে উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন।
- শ্মশানকালীর আরেকটি রূপে তার বাঁ-পাটি শিবের বুকে স্থাপিত এবং ডান হাতে ধরা খড়্গ।
- এই রূপটিও ভয়ংকর রূপ।
- তন্ত্রসাধকেরা মনে করেন, শ্মশানে শ্মশানকালীর পূজা করলে শীঘ্র সিদ্ধ হওয়া যায়।
- রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্ত্রী সারদা দেবী দক্ষিণেশ্বরে শ্মশানকালীর পূজা করেছিলেন।
কাপালিকরা শবসাধনার সময় কালীর শ্মশানকালী রূপটির ধ্যান করতেন। সেকালের ডাকাতেরা ডাকাতি করতে যাবার আগে শ্মশানঘাটে নরবলি দিয়ে ডাকাতকালী ও শ্মশানকালীর পূজা করতেন। ডাকাতদের পূজিতা যেকোনো কালীকেই ডাকাতকালী বলা হয়ে থাকে।
বিভিন্ন জায়গায় ডাকাতকালীর পূজা হয়। পশ্চিমবঙ্গের অনেক প্রাচীন শ্মশানঘাটে এখন শ্মশানকালীর পূজা হয়।
তবে গৃহস্থবাড়িতে বা পাড়ায় সর্বজনীনভাবে শ্মশানকালীর পূজা হয় না। রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন, শ্মশানকালীর ছবিও গৃহস্থের বাড়িতে রাখা উচিত নয়।
আদ্যাকালী
- মহানির্বাণ তন্ত্রে এই দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়।
- কলকাতার আদ্যাপীঠের কালী ও এই দেবীর রূপ কিন্তু এক নয় এবং আদ্যাস্ত্রোত্রের দেবীও ইনি নন।
- আদ্যাকালীর রং মেঘের মতো ঘন নীল।
- কপালে চন্দ্ররেখা, ত্রিনেত্রা। তিনি রক্তবস্ত্র পরিধানে থাকে।